অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় কমছে ঋণগ্রহণ

চীনা ব্যাংকে জমছে রেকর্ড অর্থ

চীনের ব্যাংকগুলোয় নগদ অর্থের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ নতুন করে ঋণ নিতে আগ্রহ হারানোয় ব্যাংকগুলোয় আমানত বাড়ছে দ্রুত। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, দীর্ঘদিনের আবাসন খাতের সংকট ও দুর্বল ভোক্তা চাহিদা মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এখন ব্যাংক খাতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে নিক্কেই এশিয়া।

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়নার (পিবিওসি) তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশটিতে ঋণের তুলনায় আমানত ৬৩ দশমিক ৮১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বেশি ছিল। ১৯৯৭ সালে তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর এটি সর্বোচ্চ ব্যবধান।

জুনের শেষে চীনা ব্যাংকগুলোয় ইউয়ানভিত্তিক মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৪৬ দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, এক বছর আগের তুলনায় যা ৮ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। একই সময় মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে ২৮২ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে। তবে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো আমানতের প্রবৃদ্ধি ঋণের প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ চিত্র অর্থনীতিতে সতর্কতার ইঙ্গিত দেয়। সাধারণত ব্যবসা ও ভোক্তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকলে তারা নতুন বিনিয়োগ ও ব্যয়ের জন্য বেশি ঋণ নেয়। কিন্তু বর্তমানে উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মানুষ ও প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমিয়ে নগদ অর্থ হাতে রাখাকে বেশি নিরাপদ মনে করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের আবাসন খাত কয়েক বছর ধরেই চাপের মধ্যে রয়েছে। বাড়ির দাম কমে যাওয়ায় নতুন আবাসন প্রকল্প ও ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে। এতে মর্টগেজ ঋণের চাহিদাও কমে গেছে। একই সময় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা জ্বালানি ও বিভিন্ন কাঁচামালের দামে চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে ও নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমেছে।

চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমেছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। কারখানা নির্মাণ, যন্ত্রপাতি কেনা ও অন্যান্য মূলধনি বিনিয়োগে এ ধীরগতি অর্থনৈতিক কার্যক্রমে চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কাঁচামালের উচ্চমূল্যও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ না করে নগদ অর্থ সংরক্ষণ করছে। এর প্রভাব ব্যাংকের ঋণ বিতরণেও পড়েছে। চীনে জুনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।

দেশটির উৎপাদন খাতেও প্রতিযোগিতা বেড়েছে। একই ধরনের পণ্যের দাম কমিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে অনেক কোম্পানিকে। এতে মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ইলেকট্রনিকস চীনে টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার ও রেফ্রিজারেটর বিক্রি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত দেশটির ভোক্তা ইলেকট্রনিকস বাজার থেকে সরে যাচ্ছে।

অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারাও ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকছেন। চলতি বছরের প্রথমার্ধে খুচরা বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। বছরের প্রথম তিন মাসে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ।

জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় অনেক পরিবার প্রয়োজন ছাড়া নতুন পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকছেন। এর প্রভাব ঋণ বাজারেও পড়েছে।

বছরের প্রথমার্ধে পরিবারের মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। ২০০৯ সালে এ সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর এটি সর্বনিম্ন।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ভোক্তা ব্যয় বাড়াতে চীনের সরকার স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন ভোক্তা ইলেকট্রনিক পণ্য কেনার জন্য ভর্তুকি চালু করেছে। তবে অনেক ভোক্তাই বর্তমানে ব্যবহৃত ডিভাইস বদলানোর প্রয়োজন বোধ করছে না। ফলে সরকারি প্রণোদনাও প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।

চীনের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এ ধীরগতির প্রভাব দেখা গেছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে চীনের জিডিপি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে আগের প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি কমেছে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোকে আরো বেশি ঋণ দিতে উৎসাহিত করছে পিপলস ব্যাংক অব চায়না।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর ঋণ বিতরণ বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। ৪ জুলাই অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় প্রান্তিকের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুলনামূলক সহায়ক মুদ্রানীতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।

তবে নীতিনির্ধারকদের সামনে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ১০ বেসিস পয়েন্ট সুদ কমানোর পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। তাই অর্থনীতিকে আরো চাঙ্গা করতে অতিরিক্ত সুদ কমানোর সুযোগ এখন সীমিত হয়ে পড়েছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ঋণের তুলনায় আমানতের বড় ব্যবধান শুধু ব্যাংক খাতের একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি ব্যবসা ও ভোক্তাদের আস্থার বর্তমান অবস্থাও তুলে ধরছে।

আরও